তিস্তার ভাঙনে গঙ্গাচড়ায় বিলীন আট বসতবাড়ি, হুমকির মুখে দ্বিতীয় সেতু

ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের টানা বর্ষণে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তিস্তার পানি বিপৎসীমার ছয় সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও স্থানীয় নদীতীরবর্তী জনপদগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে বন্যার পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের, যার ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। হাঁটু সমান পানি পেরিয়ে তাদের বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে, আর অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা সন্তানদের হাত ধরে ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পানিবাহিত নানা রোগব্যাধির কারণে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নোহালী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, কাঁচা ও আধাপাকা সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে থাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া থেকে শুরু করে রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার মতো জরুরি কাজেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে অনেক কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে থাকায় আমন ধানের বীজতলা ও অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এরই মধ্যে নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী কাচারিপাড়া এলাকায় তিস্তার তীব্র স্রোতে অন্তত আটটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং শত শত বিঘা আবাদি জমি নদীতে হারিয়ে গেছে।
ভাঙনের ভয়াবহতায় দিশেহারা নদীতীরবর্তী মানুষ এখন শেষ সম্বল রক্ষায় ব্যস্ত। ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে অনেকেই ঘরের টিন, ইট, কাঠ ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। এর মধ্যেই রংপুরের গঙ্গাচড়া-মহিপুর দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর রক্ষাবাঁধের প্রায় ২০০ মিটার অংশ তীব্র স্রোতে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। এই ভাঙন অব্যাহত থাকায় মূল সড়ক ও দুই জেলার মধ্যকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ চরম হুমকির মুখে পড়েছে, যা নিয়ে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ আতঙ্কিত দিন কাটাচ্ছেন।
নিঃস্ব হয়ে যাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মর্জিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মুহূর্তের মধ্যে সাজানো সংসার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতির পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় ভাঙন রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সরকারি সহায়তার পাশাপাশি দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।