রেকর্ড বৃষ্টি ও পাহাড় নিধনে ডুবছে চট্টগ্রাম বিপর্যস্ত জনজীবন

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম গত ৭ জুলাই এক রাতে ৪১২ মিলিমিটার রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কবলে পড়ে কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত ৪০ বছরের মধ্যে এটি ছিল সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। নগরীর অধিকাংশ এলাকা কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, পাশাপাশি বায়েজিদ ও টাইগারপাসসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে জেলা প্রশাসন থেকে মাইকিং করা হয়।
চট্টগ্রামের জন্য জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়, প্রতি বর্ষায় এমন চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। আবহাওয়াবিদরা একে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের ফল বললেও নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদদের মতে, এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে গত কয়েক দশকের নির্বিচারে পাহাড় কাটা, জলাধার ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এসএম সিরাজুল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে নগরীর পাঁচটি এলাকায় ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার পাহাড়ি ভূমি ছিল, যা ২০০৮ সালে কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ১৪ দশমিক ০২ বর্গকিলোমিটারে। বর্তমানে এই পরিমাণ মোট পাহাড়ি ভূমির প্রায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
চার দশক আগে চট্টগ্রামে দুই শতাধিক পাহাড় থাকলেও বর্তমানে তা এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমে এসেছে। গত ১৫ বছরে বায়েজিদ ও আকবর শাহ এলাকাতেই অন্তত ৮৮টি পাহাড় ও টিলা কাটা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান ও মামলা পরিচালনা করলেও পাহাড় কাটা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। গত দেড় বছরে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার দায়ে সাতটি নিয়মিত মামলাসহ ৬৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়েছে। এরপরও আবাসন ব্যবসা, সড়ক নির্মাণ ও বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির স্বার্থে ভূমিদস্যুরা পাহাড় নিধন অব্যাহত রেখেছে।
পাহাড় কাটার কুফল হিসেবে সড়ক ধস ও জলাবদ্ধতা এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণে ১৬টি পাহাড় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি না মেনে কাটার ফলে সড়কটি এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিবেশবিদ ইদ্রিস আলীর মতে, পাহাড় ও বনভূমি প্রাকৃতিক বৃষ্টির পানি শুষে নিতে বাধা দেয় না, কিন্তু পাহাড় কাটার ফলে বৃষ্টির পানির সঙ্গে মাটি ধুয়ে খাল ও নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শুধু সম্পদ বা অবকাঠামো নয়, পাহাড়ধস প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দুই দশকে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে অন্তত ২০০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সর্বশেষ গত দুদিনে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বর্তমানে নগরীর ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে দেড় হাজারের বেশি পরিবার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। যদিও ১৯৯৬ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পাহাড় সংরক্ষণের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, তবুও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে তা মানার হার খুবই কম। পরিবেশ অধিদপ্তর গত দুই দশকে শতাধিক মামলা করলেও বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও কার্যকর প্রতিরোধের অভাবে পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
নগরবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার মনে করেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পগুলো সমন্বয়ের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী জলাধার ও জোয়ার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বড় সংকট তৈরি করেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে স্থায়ী সমাধান হিসেবে খাল-নালা দখলমুক্ত রাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং পাহাড় সংরক্ষণে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় স্থানীয়রা পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী চক্রকে দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।