হাওরের কর্মযজ্ঞে প্রাণসঞ্চারী সুনামগঞ্জের নৌকা তৈরির গ্রাম মাইজবাড়ি

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবাননগর ইউনিয়নের মাইজবাড়ি গ্রাম এখন দেশজুড়ে ‘নৌকা তৈরির গ্রাম’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। হাওর অধ্যুষিত জনপদ হওয়ায় বছরের অধিকাংশ সময় জলমগ্ন থাকে বিস্তীর্ণ এলাকা, আর সেই জনজীবনের চলাচলের প্রধান বাহন হিসেবে নৌকার চাহিদা মেটাতে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত থাকেন এই গ্রামের কারিগররা। হাতুড়ির ঠকঠক শব্দ, করাতের ঘর্ষণ আর কাঠের গন্ধে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
কয়েক যুগ ধরে মাইজবাড়ি গ্রামে গড়ে ওঠা এই শিল্পে গ্রামের তিন হাজারের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এখানে বারকি, খিলুয়া ও ডিঙিসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকা নির্মাণ করা হয়। বছরের বারো মাসই এই গ্রাম থেকে প্রায় চার শতাধিক ছোট-বড় নৌকা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জসহ দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা নৌকা কিনতে ভিড় জমান এই গ্রামে।
নৌকার ধরন ও আকারভেদে ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকানো হয়। বছরজুড়ে এই গ্রাম থেকে প্রায় ২২ কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হলেও কারিগরদের জীবনে স্বচ্ছলতার অভাব রয়ে গেছে। ৪৫ বছর ধরে নৌকা তৈরি করা প্রবীণ কারিগর মুসাইদ আলীর মতো অনেকেরই জীবন কাটে কাঠের সঙ্গে লড়াই করে, অথচ শ্রমের ন্যায্যমূল্য থেকে তারা বঞ্চিত।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাঠের সংকট থাকায় অনেক সময় মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কাজ করতে হয় কারিগরদের। এতে বিক্রয়লব্ধ অর্থের বড় একটি অংশ মহাজনের পকেটে চলে যায়। কারিগররা মনে করেন, সহজ শর্তে সরকারি ঋণ সুবিধা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি আরও বিকশিত হবে এবং হাজারো মানুষের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন বা বিসিক সুনামগঞ্জের উপ-ব্যবস্থাপক এম এন এম আসিফ জানান, নৌকা শিল্পের উন্নয়নে বিসিক বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শর্তসাপেক্ষে ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই খাতকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে। হাওরের জনজীবনের অপরিহার্য অংশ এই নৌকা শিল্প যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।