বড়াল নদের খনন প্রকল্প: প্রতিশ্রুতির বৃত্তে স্থবিরতায় জনমনে তীব্র হতাশা

রাজশাহীর চারঘাট ও এর আশপাশের জনপদের প্রাণপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত বড়াল নদী পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। নদী খনন না হওয়ায় স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, যা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। গত ৩১ মে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের দফায় দফায় ঘোষণার পরও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় এই অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, অতীতে কৃষি, মৎস্য আহরণ ও নৌ-যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল এই বড়াল নদী। দীর্ঘদিনের অবহেলা, পলি জমে ভরাট হওয়া এবং খননের অভাবে নদীটি আজ মৃতপ্রায় খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকটে এই অঞ্চলের কৃষিখাত মুখ থুবড়ে পড়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বলেন, সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে নদীটি দ্রুত খনন করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই।
সরদহ ইউনিয়নের ঝিকরা গ্রামের কৃষক রফিকের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, নদীর পানির ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ায় সেচ খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক চাপের ফলে টিউবওয়েলের ব্যবহার বেড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধান ও সবজি চাষে পানির অভাব এখন কৃষকদের প্রধান উদ্বেগের কারণ। পরিবেশবিদদের মতে, নদীভিত্তিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস হওয়ায় গাছপালা ও মাছের প্রজনন ব্যবস্থা বিলুপ্তির পথে, যা জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বড়াল রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব মিজানুর রহমান জানান, পদ্মা থেকে বাঘাবাড়ি পর্যন্ত ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌপথের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে চারঘাট ও নাটোরের স্লুইসগেট দুটি অপসারণ করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, কেবল খনন কাজ করলেই হবে না, বরং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নই বড়ালকে বাঁচাতে পারে। চারঘাট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম বাচ্চুর দাবি, সরকারি উদ্যোগ যেন কোনোভাবেই কেবল দাপ্তরিক নথির গোলকধাঁধায় আটকে না থাকে।
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রিফাত করিম জানিয়েছেন, বড়াল নদী খননের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষে ৫২৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে প্রথম পর্যায়ে বড়াল নদীর ৪৮.৫ কিলোমিটার, নারোদ নদের ৪৩ কিলোমিটার এবং মুসা খাঁ নদীর ৬ কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন করা হবে। এখন কেবল অনুমোদনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।