আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের প্রধানের হঠাৎ পদত্যাগ দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলোইয়ের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গভীর সংকটকে সামনে এনে দিয়েছে। এই ঘটনায় আর্জেন্টিনার মূল্যস্ফীতি পরিসংখ্যান এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে জাতীয় পরিসংখ্যান ও জনশুমারি সংস্থা ইনডেকের প্রধান মার্কো লাভানিয়া পদত্যাগ করেন। অর্থমন্ত্রী লুইস কাপুতো স্বীকার করেন, মূল্যস্ফীতি হিসাবের পদ্ধতি হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়াই এই পদত্যাগের মূল কারণ। অতীতে তথ্য জালিয়াতির অভিযোগে বিতর্কিত ইতিহাস থাকা আর্জেন্টিনায় বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে, ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আর্জেন্টিনাকে মূল্যস্ফীতির তথ্য কম দেখানোর জন্য প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করেছিল।
লাভানিয়ার পদত্যাগের পর বিরোধী দলের নেতারা অভিযোগ তুলেছেন, প্রেসিডেন্ট মিলোইয়ের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কংগ্রেস সদস্য জুলিয়া স্ত্রাদা বলেন, জনপ্রিয়তা বাড়াতে মূল্যস্ফীতি কমানোর বিষয়টিকে মিলোই তার প্রধান কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি সরকারের এই পদক্ষেপকে “চালাকি” বলে মন্তব্য করেন।
বর্তমানে প্রেসিডেন্ট মিলোই দাবি করছেন, মাসিক মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণ অঙ্ক থেকে কমে তিন শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তবে লাভানিয়ার পদত্যাগ এই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এবং স্বচ্ছতা ও আস্থার বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্বায়ত্তশাসন নিয়ে উদ্বেগ ও পদ্ধতি পরিবর্তনে বিলম্ব
যদিও ইনডেকের প্রধান নিয়োগ দেয় নির্বাহী বিভাগ, তবুও ঐতিহাসিকভাবে এই সংস্থাটি রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করে এসেছে। বিশ্লেষক মার্সেলো গার্সিয়া এই ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
প্রেসিডেন্ট মিলোই অগাস্টের মধ্যে মাসিক মূল্যস্ফীতি এক শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর আগে ইনডেক জানায়, জানুয়ারি মাসের তথ্য প্রকাশে নতুন হিসাব পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। বর্তমানে ব্যবহৃত পদ্ধতিটি ২০০৪ সালে পরিচালিত এক পারিবারিক ব্যয় জরিপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
তবে অর্থমন্ত্রী কাপুতো জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত নতুন পদ্ধতি কার্যকর করা হবে না। নতুন সময়সূচি সম্পর্কে তিনি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, নতুন পদ্ধতি চালু হলে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেশি দেখা যেত। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি।
তথ্য জালিয়াতির পুরোনো ইতিহাসে জর্জরিত বিতর্ক
আর্জেন্টিনায় মূল্যস্ফীতি তথ্য নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট নেস্তর ও ক্রিস্তিনা কিরশনারের শাসনামলে সরকারি পরিসংখ্যানের ওপর জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। ২০০৭ সালে ইনডেকের কর্মী বদলের পর থেকেই তথ্য কারসাজির অভিযোগ ওঠে।
সে সময় সরকারি হিসাব অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি ছিল বেসরকারি বিশ্লেষকদের হিসাবের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এর ফলে সরকার মূল্যস্ফীতিনির্ভর বন্ডে কম সুদ দিতে পেরেছিল।
ভুল তথ্যের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আর্জেন্টিনায় আগ্রহ হারায় এবং ২০০১ সালের ঋণখেলাপির পর দেশটির বৈশ্বিক ঋণবাজারে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই অভিজ্ঞতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে সরকারি মূল্যস্ফীতি তথ্য সাধারণত স্বাধীন অর্থনীতিবিদদের হিসাবের কাছাকাছি হলেও সাম্প্রতিক এই বিতর্ক আবারও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগিয়েছে।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে এখনও ক্রয়ক্ষমতাই মুখ্য
আর্জেন্টিনায় অতীতে চরম মূল্যস্ফীতির সময়ে মানুষ প্রতিদিন দাম বাড়ার আশঙ্কায় দ্রুত পেসো খরচ করে ফেলত। এখনো অনেক নাগরিক অর্থনীতির অবস্থা বিচার করেন—তাদের টাকায় কতটা কেনাকাটা করা যায়, তার ওপর ভিত্তি করে।
একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৩১ বছর বয়সী আইলেন মেন্তা বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে তার ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তার দাবি, ভাড়া সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পর এখন তার বেতনের অর্ধেক চলে যাচ্ছে বাসাভাড়ায়, যেখানে আগে তা ছিল প্রায় ত্রিশ শতাংশ।
তবে কিছু ভাড়াটে জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থেকে বাঁচতে মালিকদের আর অতিরিক্ত বেশি প্রাথমিক ভাড়া নির্ধারণ করতে না হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে ভাড়া কমেছে।
আইলেন মেন্তার মতে, লাভানিয়ার পদত্যাগ পরিসংখ্যান দপ্তরের ওপর তার আস্থা পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে, যা জনগণের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসকেই প্রতিফলিত করে।
অর্থনীতিবিদ লাউরা কাউয়ো জানান, পেসোর অবমূল্যায়ন ও গ্যাস–বিদ্যুৎ ভর্তুকি কমানোর ফলে ২০২৪ সালে মূল্যস্ফীতির বড় ধাক্কা লাগে, যার প্রভাব এখনো অনেক মানুষের জীবনে রয়ে গেছে। ২০২৫ সালে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও আগের ক্ষতি পূরণ হয়নি।
বিতর্ক সত্ত্বেও সমর্থকদের আস্থা অটুট
এই বিতর্ক প্রেসিডেন্ট মিলোইয়ের ঘোর সমর্থকদের মনোভাব খুব একটা বদলাতে পারেনি। তাদের বিশ্বাস, অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার পেছনে মিলোইয়ের ভূমিকাই মুখ্য।
অনেকের ধারণা, এই সংকট শিগগিরই কেটে যাবে এবং বাজার ও অর্থনীতির অবস্থার আরও উন্নতি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা জোরদার করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারী ও জনগণের আস্থা ধরে রাখাই এখন মিলোই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লাভানিয়ার পদত্যাগ প্রমাণ করেছে—আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে মূল্যস্ফীতি তথ্য কতটা সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।