মুসলমানদের টার্গেট? ভারতের লক্ষ লক্ষ ভোটাধিকার হারানোয় ক্ষোভ

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এই মাসে গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। তবে ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রক্রিয়ায় অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের বাসিন্দা ৭৩ বছর বয়সী নবীজান মন্ডল গত ৫০ বছর ধরে জাতীয়, রাজ্য ও স্থানীয়—সব ধরনের নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এবার তিনি বিস্মিত হয়ে দেখেন, তার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। অথচ তার পরিবারের অন্য সদস্যরা তালিকায় রয়েছেন।
নবীজানের ক্ষেত্রে সমস্যার মূল কারণ ছিল নামের ভিন্নতা। বিভিন্ন সরকারি নথিতে তিনি “নবিজান” নামে পরিচিত হলেও ভোটার আইডিতে তার নাম ছিল ভিন্নভাবে উল্লেখিত। এই অসঙ্গতির কারণেই তার নাম বাদ পড়ে যায়।
ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) চলতি মাসে ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (Special Intensive Revision – SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে। এই প্রক্রিয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।
এর মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ ভোটারকে অনুপস্থিত বা মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ৩০ লাখ ভোটার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোট দিতে পারবেন না। তবে নির্বাচনের আগে এত বিপুল সংখ্যক মামলার নিষ্পত্তি সম্ভব নয় বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যে জানিয়েছে, যাদের মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, তারা আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না।
পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ক্ষেত্রে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন—মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার, উত্তর ২৪ পরগণায় ৩ লাখ ৩০ হাজার ভোটারের নাম মুছে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি থাকা সত্ত্বেও নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নামের বানান ভিন্নতা, বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন, অন্য জায়গায় স্থানান্তরের প্রমাণ বা পুরোনো তালিকায় নাম না থাকার মতো কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।
মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা সোহিদুল ইসলাম, যিনি আগের নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, এবার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। তিনি বলেন, “আমি গভীর কষ্টে আছি। কখনো ভাবিনি আমার নাম মুছে যাবে। এখন শুধু চেষ্টা করছি আবার নাম অন্তর্ভুক্ত করার।”
নির্বাচন কমিশনের দাবি, এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল ডুপ্লিকেট বা মৃত ভোটারদের বাদ দেওয়া এবং প্রকৃত ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা। তবে বিরোধী দল ও মুসলিম সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, এটি একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।
রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)-এর নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, এই প্রক্রিয়া বিজেপির পক্ষে সুবিধা তৈরি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার ভাষায়, “গণতান্ত্রিকভাবে জিততে না পেরে বিজেপি জালিয়াতির মাধ্যমে ভোট দখলের চেষ্টা করছে।”
অন্যদিকে বিজেপি নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ভোটার তালিকা থেকে অযোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া প্রয়োজন এবং তালিকায় কোনো অনিয়ম থাকা উচিত নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল। অনেক ক্ষেত্রে তালিকা দ্রুত প্রকাশ করা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
গবেষণা সংস্থা সাবার ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু নির্বাচনী এলাকায় মুসলমানদের নাম বাদ পড়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। যেমন নন্দীগ্রামে, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ২৫ শতাংশ, সেখানে বাদ পড়া ভোটারের ৯৫ শতাংশের বেশি মুসলিম।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তাদের অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের পর নাম বা ঠিকানা পরিবর্তনের কারণে সমস্যা আরও বাড়ছে।
গোবিন্দপুর গ্রামের জেসমিনা খাতুন জানান, তার সব নথি ঠিক থাকলেও তার বাবার নামের সামান্য বানান ভিন্নতার কারণে তার নাম বাদ পড়েছে। “আমি খুব উদ্বিগ্ন। আগে তিনবার ভোট দিয়েছি, কিন্তু এবার কী হবে জানি না,” বলেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদবের মতে, এই প্রক্রিয়া নারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। “পুরুষদের তুলনায় নারীদের কাগজপত্র প্রমাণ করা অনেক কঠিন। ফলে তাদের নাম বেশি বাদ পড়ছে,” বলেন তিনি।
সামগ্রিকভাবে, এই পরিস্থিতি রাজ্যজুড়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এটি শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
মুর্শিদাবাদের সোহিদুল ইসলামের কথায় সেই হতাশার প্রতিফলন, “এই মাটিতে আমাদের জন্ম, এখানেই আমরা ভোট দিয়েছি। এখন হঠাৎ করে আমাদের অস্তিত্বই যেন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।”
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
