মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ‘মক্কা জয়েন্ট ডিটারেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ নামে পরিচিত এই সমঝোতাটি শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত হয়। এতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিজ নিজ দেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হলে তা তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে গণ্য হবে। এটি মূলত ওই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ত্রিপক্ষীয় জোট ওই অঞ্চলের বিদ্যমান নিরাপত্তা কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। মূলত গত অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং পরবর্তীতে ইরান ঘিরে তৈরি হওয়া সংকটই এই দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ জুগিয়েছে।
এই জোটের মাধ্যমে তুরস্কের সামরিক শিল্প সক্ষমতা, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রভাব এবং পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত প্রতিরোধ সক্ষমতাকে একত্রিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের শক্তিশালী ন্যাটোর সদস্যপদ, সৌদি আরবের জ্বালানি সমৃদ্ধি এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি এই জোটকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির মৃত্যুতে পাকিস্তান ও তুরস্কের তীব্র নিন্দার বিষয়টি এই জোট গঠনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে।
চুক্তিটি কেবল সামরিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, জ্বালানি খাত এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দেশগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। তবে তুরস্কের একজন সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি আত্মরক্ষামূলক। একই সাথে এই জোট অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
যদিও এই চুক্তিকে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে তেহরান থেকে এর কিছুটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। ইরানি এমপি ইব্রাহিম রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই চুক্তির সমালোচনা করে দাবি করেছেন, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যে নিরাপত্তা পায়নি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে কাগজের চুক্তিতেও তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে, ইসরায়েলি পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক গ্রুপের বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিন ফারুকের মতে, এই প্রতিরক্ষা জোট প্রমাণ করে যে, এই দেশগুলো বুঝে গেছে যে নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার দয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। দীর্ঘদিনের মার্কিন নির্ভরতার পরিবর্তে এখন নিজস্ব সক্ষমতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দিচ্ছে এই তিন দেশ। ধারণা করা হচ্ছে, এই সমঝোতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
