কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইন কার্যকর করল ইউরোপীয় ইউনিয়ন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ওপর বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইন কার্যকর করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। গত ২ আগস্ট থেকে ইউরোপের ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাক্ট’-এর নতুন একটি ধাপ কার্যকর হয়েছে, যা প্রযুক্তি বিশ্বের নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে এক যুগান্তকারী সংযোজন। এর আগে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেমন সাধারণ তথ্য সুরক্ষা নীতি বা জিডিপিআর প্রণয়ন করেছিল, নতুন এই আইনটি মূলত সেই ডিজিটাল নিয়মনীতির পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
নতুন এই আইনের ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখন থেকে চ্যাটবট বা এ ধরনের কোনো এআই সিস্টেম মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করলে ব্যবহারকারীকে স্পষ্টত জানাতে হবে যে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথা বলছেন। এছাড়া, যেসব এআই সিস্টেম ছবি, অডিও, ভিডিও বা লেখা তৈরি বা পরিবর্তন করতে পারে, সেগুলোকে অবশ্যই মেশিনে শনাক্তযোগ্য মার্কিং বা চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে।
আইনের শর্ত অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। নীতিমালা ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫০ লাখ ইউরো বা প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ মার্কিন ডলার অথবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের ৩ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে। মূলত এই আইনের লক্ষ্য প্রযুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নয়, বরং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এদিকে, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এআই সিস্টেমগুলোর জন্য নির্ধারিত কঠোর বাধ্যবাধকতাগুলো আপাতত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত বায়োমেট্রিক্স, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত এআই প্রযুক্তিগুলোর ওপর নজরদারির নিয়মগুলো ২০২৭ সালের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের দাবি, প্রযুক্তির উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত না করে কোম্পানিগুলোকে যথাযথ কারিগরি মানদণ্ড গ্রহণের সময় দিতেই এই সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত এআই সিস্টেমগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল, যা মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অধিকার খর্ব করতে পারে। দেরিতে হলেও এসব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর কঠোর নজরদারি না থাকলে বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এআই নিয়ন্ত্রণের জটিল পথ পাড়ি দিচ্ছে। যদিও অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বৈশ্বিক কার্যক্রমের স্বার্থে ইউরোপের স্বচ্ছতার মানদণ্ড বিশ্বজুড়ে অনুসরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে এই আইনের শক্তিশালী সুরক্ষা কবচগুলো ইউরোপের ভূখণ্ডের বাইরে কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। প্রযুক্তি জগতের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই আইন শেষ পর্যন্ত কতটুকু সুফল বয়ে আনে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
