যুক্তরাজ্যের হাসপাতালে অবহেলায় মা ও নবজাতকের মৃত্যু বাড়ছে, সংকটের মুখে প্রসূতি সেবা ব্যবস্থা

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রসূতি এবং নবজাতকের মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনে নটিংহাম এবং লিডসের মতো শহরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞ ডোনা ওকেনডেন এবং ব্যারোনেস ভ্যালেরি আমোসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই তদন্তগুলো বলছে, যথাযথ যত্নের অভাব এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে শত শত মায়ের মৃত্যু বা শারীরিক ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে, যা মূলত এড়ানো সম্ভব ছিল।
ওকেনডেন রিপোর্ট অনুযায়ী, নটিংহাম ইউনিভার্সিটি হসপিটালস ট্রাস্টের অধীনে গত ১৩ বছরে ৪৪৪ জন নারী ও ৭৬ জন নবজাতক মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রতিবেদনটিতে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ‘বিষাক্ত পরিবেশ’ এবং ‘বুলিং’ বা হয়রানিমূলক সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নবজাতকের মরদেহ ক্লিনিক্যাল বর্জ্য হিসেবে ভুলবশত ফেলে দেওয়ার মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটেছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, সংকট নিরসনে বারবার সতর্কবার্তা পাওয়া সত্ত্বেও হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
গবেষণাসংস্থা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির তথ্যানুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে প্রতি এক লাখ প্রসবের বিপরীতে মাতৃমৃত্যুর হার ১২.৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এটি ২০০৯-২০১১ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বর্ণবাদ এবং বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আমোস রিপোর্ট জানিয়েছে, শ্বেতাঙ্গ নারীদের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের মৃত্যুর হার প্রায় তিনগুণ বেশি। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী নারীরাও উন্নত সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার তালিকায় সামনের সারিতে রয়েছেন।
লিডস টিচিং হসপিটালেও প্রায় একই ধরনের অব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হয়েছে। বিবিসি’র এক অনুসন্ধানের পর সেখানে তদন্ত শুরু হয়, যেখানে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত ৫৬টি নবজাতক ও দুজন প্রসূতির মৃত্যু ‘প্রতিরোধযোগ্য’ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কেয়ার কোয়ালিটি কমিশন হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবার মানকে ‘পর্যাপ্ত নয়’ বলে উল্লেখ করেছে।
এই সংকটের প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেমস মারে বিষয়টিকে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা সন্ধিক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ৪১ মিলিয়ন পাউন্ড বা ৫৪.৭৫ মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া ১০০০ ধাত্রী বা মিডওয়াইফ নিয়োগ এবং একজন নতুন প্রসূতি ও নবজাতক কমিশনার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যিনি সরাসরি পার্লামেন্টের কাছে জবাবদিহি করবেন।
এদিকে যুক্তরাজ্যের এই পরিস্থিতির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বীমাভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে সেখানে উন্নত চিকিৎসার নাগাল পাওয়া অনেকের জন্য দুষ্কর। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, কৃষ্ণাঙ্গ রোগীরা উন্নত হাসপাতালের কাছাকাছি বাস করলেও মানহীন হাসপাতালে সেবা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ ব্যুরোর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলছে, দেশটিতে প্রায় ১০ কোটি নাগরিক প্রায় ২২ হাজার কোটি ডলারের চিকিৎসা ঋণের ভারে জর্জরিত, যা বিশ্বব্যাপী উন্নত দেশগুলোর মধ্যে দেশটিকে এক নাজুক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
