গণতন্ত্র সুসংহতকরণে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতা: প্রধানমন্ত্রী

গণতান্ত্রিক যাত্রা সুসংহত করতে রাষ্ট্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, যে রাষ্ট্রে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার নেই, সেই দেশ কখনোই গণতান্ত্রিক বা মানবিক রাষ্ট্র হতে পারে না।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানী ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই সভার আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশের জনগণ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এই গণতান্ত্রিক যাত্রা সুসংহত করতে ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচার সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত, যাতে কোনো মানুষ অর্থের অভাবে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হয়। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার লিগ্যাল এইড কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।

তিনি সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, ন্যায়বিচার যেন কেবল আইনের বইয়ে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং প্রতিটি মানুষের জীবনে তা সত্য ও বাস্তব হয়ে ওঠে। ন্যায়বিচার কেবল আদালত কেন্দ্রিক কোনো প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত মূল্যবোধ যা রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি, সিদ্ধান্ত ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যায়পরায়ণতা তখনই অর্থপূর্ণ হয় যখন আইন মানুষের ওপর প্রয়োগের যান্ত্রিক উপায় না হয়ে তাদের মর্যাদা সংরক্ষণ এবং অধিকার নিশ্চিত করার গভীর নৈতিক অঙ্গীকারে পরিণত হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসেও এই ন্যায়বোধ একটি শক্তিশালী প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। যেহেতু ন্যায়বিচার প্রাপ্তি প্রতিটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার, তাই সরকার যথাসাধ্য আইনি সহায়তা দেবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সেরা প্যানেল আইনজীবী হিসেবে ঢাকার সায়েম খান ও রাজশাহীর নীলিমা বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ক্রেস্ট ও সম্মাননা গ্রহণ করেন। এছাড়া, সারা দেশে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি সেল ব্র্যাককে মনোনীত করা হয়। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা পত্র ও ক্রেস্ট গ্রহণ করেন।

লিগ্যাল এইড ব্যবস্থায় মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাস্টিস ডিলেড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ অর্থাৎ বিচার বিলম্ব মানেই বিচার অস্বীকার। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলার আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার বিরোধ স্বল্প সময়ে ও কম খরচে আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমেছে এবং সরকারের খরচও হ্রাস পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় মানুষ প্রাথমিক সঠিক পরামর্শের অভাবে সাধারণ বিরোধকে বড় করে তোলে, যা পরবর্তীতে জটিল রূপ ধারণ করে। ফলে মানুষ বিচার বিমুখ হয়ে পড়ে অথবা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। সরকারের লিগ্যাল এইড হেল্পলাইন এই ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। কোনো নাগরিক অর্থের অভাবে আইনের আশ্রয় বা ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত থাকবে, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য নয়।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে নিজেও দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখন তিনি দেখেছেন অনেক কারাবন্দী শুধুমাত্র আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ার কারণে বছরের পর বছর বিনা বিচারে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। অর্থের অভাবে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাম্য হতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, যেকোনো রাষ্ট্র ও সমাজের অগ্রগতি ও শান্তির ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার। বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ সমমর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বসবাস করবে, এটিই সব যুগেই মানুষের আকাঙ্ক্ষা। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সমতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক আস্থা অপরিহার্য।

অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনজুরুল হাসান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

০%
০%
০%
০%