Advertisement

খলনায়ক সিনেমার বিতর্কিত যাত্রা ও বলিউডের ইতিহাসের এক নাটকীয় অধ্যায়

নব্বইয়ের দশকের উত্তাল ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের কথা বললে সবার আগে যে নামটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা হলো সুভাষ ঘাই পরিচালিত কালজয়ী সিনেমা ‘খলনায়ক’। ১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ের ধারাবাহিক বিস্ফোরণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ছবিটি যেভাবে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিল, তা আজও রূপকথার মতো শোনায়। মুক্তির আগে বিতর্ক, মামলা আর তারকাসংকট—সব মিলিয়ে ‘খলনায়ক’ হয়ে উঠেছিল বলিউডের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় এবং আলোচিত প্রকল্প।

ছবির অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘চোলি কে পিছে ক্যা হ্যায়’ গানটি মুক্তির পরপরই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল। সামাজিক সংগঠন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো গানটিকে নারীদের অবমাননাকর এবং অশ্লীল আখ্যা দিয়ে সিনেমাটি নিষিদ্ধ করার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। পরিস্থিতি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। নির্মাতারা তখন দিশেহারা, কারণ আদালতের রায় প্রতিকূলে গেলে পুরো সিনেমাটির মুক্তিই পড়ে যেত অনিশ্চয়তার মুখে। শেষ পর্যন্ত শিল্পের স্বাধীনতা বজায় রেখে আদালত গানটিকে ছাড়পত্র দেয়, যা ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য এক বড় বিজয় ছিল।

বিজ্ঞাপন

সেই উত্তাল সময়ে মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিবসেনা প্রধান বাল ঠাকরের ভূমিকা ছিল বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। সুভাষ ঘাই যখন তাঁর সাথে দেখা করতে যান, তখন তিনি বিতর্কটিকে অত্যন্ত কৌশলী ও স্বভাবসুলভ রসিকতায় উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ‘চোলির পেছনে যা আছে, তা তো চোলির পেছনেই আছে’—তাঁর এই মন্তব্যে মূলত অহেতুক বিতর্কের অবসান ঘটেছিল এবং মহারাষ্ট্রে সিনেমাটি নির্বিঘ্নে মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়েছিল।

তবে বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই আসে জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত। অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে প্রধান অভিনেতা সঞ্জয় দত্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। পর্দার ‘বল্লু’ যখন বাস্তবে পুলিশের শিকলে বন্দী, তখন বাস্তব ও সিনেমার রেখা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। একদিকে সঞ্জয় দত্তের আইনি লড়াই, অন্যদিকে সুভাষ ঘাইয়ের ওপর আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাঁদা দাবির চাপ—সব মিলিয়ে পুরো ‘খলনায়ক’ প্রকল্পটি ছিল এক জীবন্ত বারুদের স্তূপ।

বিজ্ঞাপন

এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দর্শকদের আগ্রহের কমতি ছিল না। বরং বিতর্কগুলোই যেন ছবিটির প্রচারণার কাজ করেছিল। পর্দায় মাধুরী দীক্ষিতের মোহময়ী নাচ আর অভিনয়ের জাদু দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। সঞ্জয় দত্তের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় হিসেবে ‘খলনায়ক’ আজও দর্শক হৃদয়ে অমর হয়ে আছে। বিতর্ক আর সংকটের কঠিন পথ পাড়ি দিয়েও সিনেমাটি যে স্থায়ী আসন গড়েছে, তা মূলত তার নির্মাণশৈলী এবং অসামান্য গল্পের কারণেই।

তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে আজ ‘খলনায়ক’ কেবল একটি বাণিজ্যিক সিনেমা নয়, বরং ভারতীয় পপ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। এটি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে একটি গান জাতীয় বিতর্কের জন্ম দেয়, কীভাবে আদালত শিল্পের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে এবং প্রতিকূলতার ঝড়েও কীভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে টিকে থাকে একটি কালজয়ী চলচ্চিত্র।

0%
0%
0%
0%