চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে এক অনন্য নাম মেজবাউর রহমান সুমন। চার বছর আগে ‘হাওয়া’র জাদুতে বুঁদ করেছিলেন দর্শককে, আর সেই রেশ কাটতে না কাটতেই ঈদুল আজহায় উপহার দিয়েছেন ‘রইদ’। মুক্তির পর থেকেই দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও প্রশংসার জোয়ারে ভাসছে ছবিটি। সম্প্রতি এক একান্ত আলাপচারিতায় এই গুণী নির্মাতা উন্মোচন করলেন ‘রইদ’-এর নেপথ্য আখ্যান, নির্মাণশৈলীর খুঁটিনাটি আর ভবিষ্যতের স্বপ্নযাত্রার গল্প।
‘রইদ’ কেবল দুটি মানুষের প্রেমের আখ্যান নয়, বরং এটি হাজার বছরের পুরনো লোকজ সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার এক গভীর ব্যবচ্ছেদ। পরিচালক সুমনের মতে, প্রেমের অন্তরালে এখানে উঠে এসেছে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, ধর্মতাত্ত্বিক জটিলতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অমোঘ বন্ধনের প্রশ্ন। চিত্রনাট্য লেখার সময় থেকেই মানুষের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা তাকে বারবার তাড়িত করেছে। সাধু ও পাগলির সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছেন মানুষের চিরন্তন অস্তিত্বের রহস্য।
সিলেটের শাহ আরেফিন টিলায় মাসের পর মাস সময় কাটানোর নেপথ্যে ছিল চরিত্রের সঙ্গে আত্মিক যোগসূত্র গড়ার তাগিদ। সুমনের ভাষায়, চরিত্রগুলো প্রকৃতিরই অংশ। তাই তাদের পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে সেই জীবনযাত্রার ভেতরে প্রবেশ করা অপরিহার্য ছিল। ‘হাওয়া’র মতোই ‘রইদ’-এর নির্মাণেও প্রায় একই টিম কাজ করেছে, যার ফলে পারস্পরিক বিশ্বাস ও বোঝাপড়ায় গড়ে উঠেছে এক চমৎকার সৃজনশীল পরিবেশ। শুটিংয়ের আট-দশ মাস তাদের কাছে কেবল কর্মসময় নয়, বরং এক অনবদ্য স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে।
সেট তৈরির ক্ষেত্রেও ছিল চূড়ান্ত শৈল্পিক নিষ্ঠা। যেখানে কিছুই ছিল না, সেখানে তিল তিল করে গড়ে তোলা হয়েছিল ছবির জগত। তবে গল্পের প্রয়োজনে শেষ পর্যন্ত সেই সেট আগুনে পুড়িয়ে ফেলার দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। সুমন জানান, সেটটি তখন আর কেবল কাজের জায়গা ছিল না, হয়ে উঠেছিল তাদের ঠিকানা। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা সেই বাড়িটি দেখে কলাকুশলীদের অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। এটি ছিল তাদের শ্রম, ঘাম আর আবেগের এক বিচ্ছেদী মুহূর্ত।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কই ‘রইদ’-এর প্রাণ। নির্মাতা মনে করেন, আধুনিকতা আমাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করলেও, লোকজ বিশ্বাসের গভীরে প্রকৃতি এখনো মানুষের পরম আত্মীয়। গরু, মহিষ থেকে শুরু করে ব্যাঙ কিংবা পিঁপড়া—প্রত্যেকটি প্রাণীকে তিনি গল্পের অবিচ্ছেদ্য চরিত্র হিসেবেই তুলে এনেছেন। তার মতে, মানুষ প্রকৃতির বাইরে কোনো একক সত্তা নয়, বরং প্রকৃতির প্রতিটি সংকেতই আমাদের জীবনের আয়না।
‘হাওয়া’র আকাশচুম্বী সাফল্যকে চাপের পরিবর্তে অনুপ্রেরণা হিসেবেই নিয়েছেন সুমন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলা চলচ্চিত্রের সংকট গল্পের অভাব নয়, বরং নিজস্বতার ওপর আস্থার অভাব। তিনি মনে করেন, অন্যের অনুকরণ না করে আমাদের মাটির গল্পগুলোকেই নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মোহ নয়, বরং মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ই একটি চলচ্চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে স্বকীয়তা দেয়।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে সুমন জানান, তিনি কেবল একটি ঘরানায় আটকে থাকতে চান না। মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করাই তার মূল লক্ষ্য। পরবর্তী ছবি নিয়ে এরই মধ্যে চিত্রনাট্যের কাজ শুরু করেছেন। নতুন বছরেই হয়তো ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন নতুন কোনো গল্প নিয়ে। সুমনের এই সৃজনশীল যাত্রা ও নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষা বাংলা সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা ভক্ত ও সমালোচকদের।