মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা: বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে ৯০ ডলারের কাছাকাছি

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সহিংসতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার আলোচনা যখন থমকে রয়েছে, ঠিক তখনই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর জেরে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক লাফে দুই শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগামী অক্টোবরে সরবরাহের চুক্তিতে ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৮৯.৬১ ডলারে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা শুরুর পর থেকে এই জ্বালানি তেলের মূল্য প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওমান সাগরের সংযোগস্থল হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হতো, যা এখন প্রায় বন্ধ বললেই চলে।
সিডনিভিত্তিক কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে বাজার অংশীজনদের আশা একেবারে ফুরিয়ে না গেলেও তাদের আত্মবিশ্বাস ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী আলোচনা কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া যত দীর্ঘায়িত হবে, চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় তত বাড়বে। মাসের শুরুর দিকের ইতিবাচক মনোভাব এখন অনেকটাই কেটে গিয়ে বাজারে এক ধরনের সতর্কতা ও ঝুঁকিভিত্তিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার অভিযোগ করেছে যে, ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথি বিদ্রোহীরা বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধ অমান্য করার চেষ্টার অভিযোগে তারা পানামার পতাকাবেষ্টিত একটি মালবাহী জাহাজকে প্রতিহত ও অচল করে দিয়েছে। এই জোড়া হামলার ঘটনা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার বিষয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যস্থতা আলোচনা উন্নত পর্যায়ে রয়েছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ওমানের সাথে তাদের আলোচনা প্রণালী খোলার বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত নয়। মার্কিন প্রশাসনকে যুদ্ধক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত এই প্রণালী বন্ধ থাকবে বলে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, এই প্রণালীর ওপর ওয়াশিংটনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
সমুদ্রপথ বিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ যাতায়াত করলেও সম্প্রতি তা কমে মাত্র ১০টিতে দাঁড়িয়েছে। ইরান প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই জলপথ বন্ধ করার আগে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, যা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জ্বালানি বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট দাবি করেছেন যে, যৌথ সামরিক প্রচেষ্টায় এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন তেল সরবরাহের হার প্রায় ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষকেরা এই দাবির সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। টরন্টোভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমোডিটি কনটেক্সটের প্রতিষ্ঠাতা ররি জনস্টনের মতে, গত সপ্তাহে এই সরবরাহের গড় পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ প্রায় ৭ মিলিয়ন ব্যারেল।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন তাদের সর্বশেষ বাজার পূর্বাভাসে জানিয়েছে, ২০২৭ সালের আগে মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম এবং ২০২৬ সালে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় মূল্য ৮৭ ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জুন গোহ উল্লেখ করেছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে দুইমুখী যাতায়াত স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ওপেকভুক্ত দেশগুলোর পক্ষে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে না। ফলে বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি না হলে তেলের বাজার ব্যারেলপ্রতি ৮৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যেই ওঠানামা করবে।
