শরীয়তপুরে একের পর এক হত্যা: বিচার কি তবে মানববন্ধনেই আটকে থাকবে?

3 মে, 2026

SAY ALWAYS TRUTH

Subscribe

একের পর এক নারী ও শিশু হত্যার ঘটনায় যেন ক্ষোভ, আতঙ্ক আর বিচারহীনতার প্রতীকে পরিণত হচ্ছে শরীয়তপুর। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর পর প্রতিবারই নিহতদের স্বজন, সহপাঠী, প্রতিবেশী ও সচেতন নাগরিকদের রাজপথে নেমে মানববন্ধন করতে দেখা যাচ্ছে। বিচার দাবি, প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির দাবিতে ধারাবাহিক এসব কর্মসূচি এখন নতুন এক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—ন্যায়বিচার পেতে কি শরীয়তপুরবাসীকে বারবার রাস্তায় নামতেই হবে?

সর্বশেষ গত এপ্রিলের শেষ দিকে নড়িয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার (১৮) হত্যাকাণ্ড ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে জেলা। তানজিলার মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন তার পরিবার, সহপাঠী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ। শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেন নিহতের স্বজন, শিক্ষার্থী, ছাত্রদল নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

মানববন্ধনে নিহতের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, তানজিলাকে তার স্বামী অপু ব্যাপারী, শ্বশুর রাসেল ব্যাপারী এবং শাশুড়ি আলো বেগম নির্মমভাবে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। পরে মরদেহ ঝুলিয়ে রেখে ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি তাদের। এ ঘটনায় নড়িয়া থানায় মামলা গ্রহণে গড়িমসি এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন স্বজনরা।

এর আগে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জাজিরা উপজেলার গৃহবধূ দোলা আক্তার হত্যাকাণ্ডে বিচার দাবিতে রাজপথে নামেন স্থানীয়রা। শরীয়তপুরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তারা অভিযুক্ত শওকত শেখ ও রুমা আক্তারের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে বলেন, হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকায় অপরাধীরা আরও সাহস পাচ্ছে, যা সমাজের জন্য ভয়াবহ সংকেত।

এরও আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সখিপুরে মাত্র ছয় বছর বয়সী শিশু তায়েবা হত্যাকাণ্ড পুরো জেলাজুড়ে নাড়া দেয়। নিখোঁজের কয়েকদিন পর সেপটিক ট্যাংক থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় নেমে আসে শোক ও ক্ষোভের ছায়া। পরে চাচি আয়শা বেগমসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবিতে আদালত চত্বর, উপজেলা সদর ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একাধিকবার মানববন্ধন করেন স্বজন ও এলাকাবাসী।

শুধু এসব ঘটনাই নয়, গোসাইরহাট উপজেলার   জয়নুল আবেদিন ঢালী হত্যা মামলায় দোষীদের ফাঁসির দাবিতেও একাধিকবার মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া আলোচিত নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ডে প্রায় প্রতিবারই একই চিত্র দেখা গেছে—স্বজনদের কান্না, এলাকাবাসীর ক্ষোভ এবং বিচার দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দীর্ঘ সারি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করতে গিয়ে অনেক সময় জটিলতার মুখে পড়তে হয়। কোথাও অভিযোগ গ্রহণে বিলম্ব, কোথাও তদন্তের ধীরগতি, আবার কোথাও প্রভাবশালীদের ছায়া—সব মিলিয়ে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে হতাশা ও অনাস্থা।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “প্রতিবারই কেউ না কেউ খুন হচ্ছে, আর বিচার চাইতে আমাদের রাজপথে নামতে হচ্ছে। থানায় যেতে হয়, প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয়। একজন নাগরিক হিসেবে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য আর কতবার এভাবে দাঁড়াতে হবে?”

সচেতন মহলের অনেকেই মনে করছেন, নারী ও শিশু হত্যা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ নজরদারি, শক্তিশালী তদন্ত ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।

শরীয়তপুরবাসীর একটাই প্রত্যাশা—প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী তদন্ত নিশ্চিত করে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জন হারিয়ে ন্যায়বিচারের আশায় রাজপথে দাঁড়াতে না হয়।

0%
0%
0%
0%